সেই আই পি এস মহিলা অফিসারকে বাংলার মানুষ আজও ভোলে নি

Spread the love

সংবাদ আবির্ভাব : ২০১২ সালের সেই ফেব্রুয়ারি মাস। তিলোত্তমার প্রাণকেন্দ্র পার্ক স্ট্রিট তখন এক অদ্ভুত অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঝলমলে আলো আর রাতের পার্টিগুলোতে যখন মানুষ মেতে আছে, ঠিক তখনই এক নারী তাঁর জীবনের সবথেকে অন্ধকার অভিজ্ঞতার কথা জনসমক্ষে নিয়ে এলেন। কিন্তু সেই সময়কার সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহাওয়া ছিল অন্যরকম। অত্যন্ত প্রভাবশালী জায়গা থেকে সেই অভিযোগকে ‘ছোট ঘটনা’ এবং ‘ সাজানো’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একপাশে ছিল বিপুল ক্ষমতা আর অন্যপাশে ছিল এক একলা নারীর হাহাকার। এই অসম যুদ্ধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন কলকাতা পুলিশের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান দময়ন্তী সেন। তাঁর ওপর দায়িত্ব ছিল সত্য খুঁজে বের করার, কিন্তু সেই পথ ছিল আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো।

লালবাজারের সেই পুরনো ঐতিহ্যবাহী ইমারত। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় আজও সেখানে ইতিহাসের গন্ধ পাওয়া যায়। দময়ন্তী সেনের অফিসের ঘরটিতে তখন থমথমে নিস্তব্ধতা। টেবিলের ওপর রাখা কাচের পেপারওয়েটটি মৃদু আলোয় চকচক করছিল, আর সামনে রাখা ছিল পার্ক স্ট্রিট মামলার সেই বিতর্কিত ডায়েরি। দময়ন্তী জানতেন, কেবল মুখে বললে হবে না, এখানে প্রয়োজন অকাট্য প্রমাণ। সিলিং ফ্যানের একঘেঁয়ে শব্দের মাঝে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করতেন। ল্যাপটপের ঝাপসা লেন্সের সেই ফুটেজগুলোতে তিনি খুঁজতেন সেই বিশেষ গাড়িটিকে, যেটি সেই রাতে পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁর চোখের নিচে ক্লান্তির কালো দাগ পড়লেও, দৃষ্টি ছিল শিকারি পাখির মতো তীক্ষ্ণ।

তদন্তের প্রতিটি ধাপে তাঁর কাছে আসছিল অদৃশ্য সব বাধা। অফিসের ল্যান্ডলাইন ফোনটি যখন বাজত, তখন ওপার থেকে আসত তদন্তের গতি কমিয়ে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। ফ্লুরোসেন্ট আলোর মৃদু গুঞ্জনের নিচে বসে দময়ন্তী ফাইলগুলোতে যখন কলমের আঁচড় কাটতেন, তখন তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে আসত। তিনি কোনো ‘সুপারহিরো’ হতে চাননি, তিনি কেবল চেয়েছিলেন খাকি উর্দির মান রক্ষা করতে। তিনি নির্যাতিতা মহিলার সাথে কথা বলার সময় পুলিশ অফিসারের চেয়েও বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠতেন। কাগজের সোঁদা গন্ধ আর কালির ঘ্রাণে ভরা সেই ঘরে বসেই তিনি বুঝেছিলেন, এই লড়াই কেবল একজন নারীর নয়, এটি গোটা বিচারব্যবস্থার লড়াই।

তদন্তের এক পর্যায়ে দময়ন্তী লক্ষ্য করলেন, অপরাধীরা শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। তিনি তাঁর বিশেষ টিমকে নির্দেশ দিলেন ঝড়ের গতিতে অভিযান চালাতে। সেই রাতগুলোতে দময়ন্তী বাড়ি ফিরতেন না। অফিসের শক্ত কাঠের চেয়ারে বসে তিনি অপেক্ষা করতেন সোর্সদের খবরের জন্য। যখন প্রথম অপরাধী ধরা পড়ল, তখন চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। প্রভাবশালী মহলের একাংশ তখনও বিশ্বাস করতে পারছিল না যে একজন অফিসার এত বড় ঝুঁকি নিতে পারেন। কিন্তু দময়ন্তী ছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তে অবিচল। প্রতিটি জেরা, প্রতিটি ফরেনসিক রিপোর্ট তিনি নিজে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতেন যাতে অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে।

তদন্তের রুদ্ধশ্বাস কয়েকটা দিন শেষে যখন দময়ন্তী সেন প্রমাণ করে দিলেন যে সেই অভিযোগটি সম্পূর্ণ সত্য এবং সাজানো নয়, তখন গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে রাজপথে যখন অন্যায় হয়, তখন কোনো ‘ছোট ঘটনা’ বা ‘বড় ঘটনা’ বলে কিছু হয় না—সবই অপরাধ। তাঁর এই জয় ছিল আদতে সেই নির্যাতিতা নারীর বিশ্বাসের জয়। কিন্তু এই অদম্য সততার পুরস্কার হিসেবে তাঁকে খুব দ্রুতই ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই বদলির অর্ডারের ওপর যখন তিনি সই করছিলেন, তখন তাঁর হাতে কোনো কম্পন ছিল না। তিনি জানতেন, তাঁর কাজ তিনি সততার সাথে সম্পন্ন করেছেন।

দময়ন্তী সেনের এই তদন্ত কেবল একটি মামলা সমাধান ছিল না, এটি ছিল একবিংশ শতাব্দীর বাংলার পুলিশি ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ। তিনি শিখিয়েছেন যে ক্ষমতার সামনে মাথা না নুইয়ে কীভাবে শিরদাঁড়া সোজা রেখে কাজ করতে হয়। তাঁর সেই শান্ত চাউনি আর প্রখর মেধা আজও লালবাজারের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়। আজ যখন কোনো নবীন অফিসার সেই ঐতিহাসিক ঘরে পা রাখেন, তাঁরা অনুভব করেন এক অদৃশ্য অনুপ্রেরণা। দময়ন্তী প্রমাণ করেছেন যে পুলিশ মানে কেবল লাঠি চালানো নয়, পুলিশ মানে হলো অন্ধকারের বুক চিরে সত্যের মশাল জ্বালিয়ে রাখা।

পার্ক স্ট্রিটের সেই ক্ষত হয়তো সময়ের সাথে শুকিয়ে গেছে, কিন্তু দময়ন্তী সেনের সেই লড়াই অমর হয়ে আছে। তিনি আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন যে ন্যায়বিচার যখন রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে, তখনই প্রকৃত গণতন্ত্র রক্ষা পায়। আজও যখন কলকাতায় কোনো জটিল তদন্তের কথা ওঠে, দময়ন্তী সেনের নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। তিনি কেবল একজন সুপার কপ নন, তিনি হলেন সেই নির্ভীকতার প্রতীক যা আমাদের প্রতিদিনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস জোগায়। খাকি উর্দির গরিমা এভাবেই রক্ষা পায়—কলম, বুদ্ধি আর অসীম ত্যাগের বিনিময়ে।

SOURCES:

১. “Park Street rape case”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *