
সংবাদ আবির্ভাব : হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখ বিন্দার সিং সুখু পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির কার্যালয় বিধান ভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, যেখানে তিনি বর্তমান রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন এবং গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে উন্নয়নের জন্য দলের জনগনের প্রতি দায়বদ্ধতার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সর্বদাই “দেশ কি সেবা” (দেশের সেবা)-র আদর্শে বিশ্বাসী এবং এই আদর্শ আজও সারা দেশে প্রাসঙ্গিক। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে তৃনমূল কংগ্রেস গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকলেও দৃশ্যমান উন্নয়ন খুবই সীমিত, এবং শাসনব্যবস্থা এখন মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ।
তিনি পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতি ও শাসন ব্যবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, বিশেষ করে নারদা, সারদা চিট ফান্ড এবং শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে রাজ্যে দুর্নীতি ও “সিন্ডিকেট রাজ সংস্কৃতি” বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন যে কোনও রাজ্য বা দেশ শুধুমাত্র আবেগ বা স্লোগানের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন সৎ উদ্দেশ্য ও উন্নয়নের কার্যকর বাস্তবায়ন। তিনি ভারতূয় জনতা পার্টির সমালোচনা করে বলেন, তাদের কথাবার্তা ও কাজের মধ্যে ফারাক ক্রমবর্ধমান, ফলে দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হচ্ছে। হিমাচল প্রদেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তথাকথিত “ডাবল ইঞ্জিন সরকার” জনগণের আস্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়ে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় এনেছে।
নীতিগত প্রসঙ্গে তিনি
মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন (মনরেগা)র গুরুত্ব তুলে ধরেন, যা গ্রামীণ পরিবারগুলিকে বছরে ১০০ দিনের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয়। তিনি বলেন তৎকালীন ইউপিএ চেয়ারপার্সন শ্রীমতী সনিয়া গান্ধীর সময়কালে এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংএর নেতৃত্বে এই আইন ফলিত ভাবে কার্যকর করা হয় এবং এই প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার ফলে গ্রামীণ জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আইন প্রণয়নের প্রসঙ্গে তিনি সংসদে ডিলিমিটেশন ইস্যু উত্থাপনের সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং মহিলা সংরক্ষণ বিল, ২০২৩ এর সঙ্গে একে যুক্ত করে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে ১৬ই এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এর গেজেট নোটিফিকেশন ইতিমধ্যেই জারি হয়েছে, যা এক অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে নির্দেশিত করে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে মহিলাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলে ৭৩তম ও ৭৪তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে, যেখানে পঞ্চায়েত ও স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় নগর প্রশাসন প্রতিষ্ঠানে ৩৩% সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী সুখু পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের আবেগ ও স্লোগানের ঊর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান, এবং জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছ শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কংগ্রেস প্রার্থীদের সমর্থন করার অনুরোধ করেন।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য এআইসিসি ইনচার্জ শ্রী গুলাম আহমেদ মীর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন যে বিরোধী দলনেতা শ্রী রাহুল গান্ধি সংসদে সমন্বয়ের জন্য কেরল ও পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধী দলগুলিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে জাতীয় স্তরের সমন্বয়কে রাজ্য স্তরের জোট হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন যে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস সরাসরি অল ইন্ডিয়া তৃনমুল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়ছে এবং রাজ্য ও জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক কৌশল আলাদা। তিনি বিভ্রান্তিকর মিডিয়া প্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, উল্লেখ করেন যে দলীয় হুইপ থাকা সত্ত্বেও অনেক সাংসদ অনুপস্থিত ছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি শ্রী সুভঙ্কর সরকার বলেন, কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তহবিল বণ্টন সংক্রান্ত বিরোধের কারণে গ্রামীণ উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও রাজ্য সরকার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তহবিল না দেওয়ার অভিযোগ করছে, কংগ্রেস মনে করে এই বিষয়টি সাংবিধানিক ও আইনি পথে সমাধান করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় জনতা পার্টি ও অল ইন্ডিয়া তৃনমুল কংগ্রেস—কেউই তাদের ইশতেহারে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি যথাযথভাবে তুলে ধরেনি, যা গ্রামীণ সমস্যার প্রতি তাদের গুরুত্বহীন মনোভাবকে প্রকট করে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান “দ্বিমুখী রাজনীতি”-র সমালোচনা করে বলেন, এটি রাজ্যের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং রাজনৈতিক মতবিনিময় ও আলোচনাকে সীমাবদ্ধ করেছে।
তিনি জানান যে কংগ্রেস ২৯৪টি বিধানসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ বিকল্প প্রদানের লক্ষ্যে, এবং তিনি ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
এই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন হিমাচল প্রদেশের বিধায়ক সুরেশ কুমার, আম্বা প্রসাদ, বি.পি. সিং, সুজাতা পাল, মিতা চক্রবর্তী এবং চন্দন ঘোষ চৌধুরী।