প্রয়াত বিষ্ণুপুর ঘরানার সুরসাধক পন্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

Spread the love

সৌরভ দত্ত, কলকাতা :বাংলা তথা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। জীবনের ১০০টি বসন্ত পার করে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবীণতম প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠসঙ্গীতশিল্পী পন্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় । কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই শতায়ু কিংবদন্তি। তাঁর প্রয়াণে সঙ্গীতমহল তো বটেই, সমগ্র সাংস্কৃতিক জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
২১ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ মাতৃভাষা দিবস। চলতি বছরের সেই দিনটিতেই ১০০ বছরের মাইলফলক পার করেছেন এই সুরসাধক। শতবর্ষ উদ্‌যাপনের দিনটিতেও কলকাতার গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে টানা চল্লিশ মিনিট সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন তিনি। বয়স হয়েছিল ঠিকই, তবে রেওয়াজ) খামতি ছিল না কোনওদিন। তবে দিন কয়েক আগে নিজের বাড়িতে পড়ে গিয়ে হিপ বোন ভেঙে যাওয়াতেই সমস্যার সূত্রপাত। অমিয়রঞ্জনের সুযোগ্য পুত্র শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলাতেও বিরাট শূন্যতা। এই সময় অনলাইনকে তিনি বলেন, ‘আজকের দিনটাতেই বাবাকে চলে যেতে হলো। হিপ বোন ভাঙার পরে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল। সেরেও উঠছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শ মতোই বাবাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এই বয়সে যা হয় আর কী! মারাত্মক সংক্রমণ হয়ে গিয়েছিল। তাই দিন চারেক আগে আবার -এর উডবার্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করাতে হয়। কিন্তু পরিস্থিতি মোটেই অনুকূলে ছিল না। একরকম ঘোরের মধ্যেই ছিলেন। বুধবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ সব শেষ হয়ে গেল।’
১৯২৭ সালে কলকাতার টেগোর ক্যাসেল স্ট্রিটে জন্ম অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সাঙ্গীতিক পরিবেশেই বড় হওয়া। বাঙালির নিজস্ব শাস্ত্রীয় ঘরানা বললে ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’র নামই উঠে আসে। সেই ঘরানার অন্যতম স্তম্ভ পন্ডিত সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র অমিয়রঞ্জন। তাঁর সান্নিধ্য এবং উপযুক্ত তালিমেই বেড়ে ওঠা। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও গান শিখেছেন। পরবর্তীকালে খেয়াল পরিবেশনায় তিনি যে নিজস্বতার ছাপ রেখেছিলেন, তা বর্তমানে খেয়াল গায়কদের কাছে এক বিশাল বড় পাঠশালা। তাঁর গায়কির প্রধান গুণ ছিল সুর ও শব্দের উচ্চারণশৈলী। তিনি বিশ্বাস করতেন, অহেতুক কসরত বা অতিরিক্ত তানের আড়ম্বর দিয়ে শ্রোতাকে মুগ্ধ করার চেয়ে সুরের আত্মার সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটানো অনেক বেশি জরুরি। রাগের বিস্তার এবং ধীর গতিতে রাগ রূপায়ণের বিরল ক্ষমতা ছিল অমিয়রঞ্জনের। বাবার দেখানো পথ ধরে পুত্র পন্ডিত শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিষ্ণুপুর ঘরানার ঐতিহ্য বহন করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। একইসঙ্গে তাঁর গবেষণা চলছে স্বর এবং সুরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।
সুরসাধনা, মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশনের পাশাপাশি অমিয়রঞ্জন ছিলেন শিল্পী গড়ার কারিগর। ছাত্রছাত্রীদের তালিম দিতেই জীবনের অধিকাংশ সময় নিয়োজিত করেছেন তিনি। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা ছড়িয়ে রয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। অমিয়রঞ্জনের প্রয়াণে বিষ্ণুপুর ঘরানার সেই প্রবীণ প্রজন্মের প্রত্যক্ষ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় সুরসাধকের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *