
মোল্লা জসিমউদ্দিন,
বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে উঠে দমদম বিমানবন্দর চত্বরে থাকা মসজিদে নামাজ পাঠ সংক্রান্ত মামলা। ‘নামাজের জন্য মসজিদ বাধ্যতামূলক নয় এবং বৃহত্তর জনস্বার্থে বা জাতীয় সুরক্ষার প্রয়োজনে রাজ্য বা কেন্দ্রের অধিগ্রহণ করা জমিতে কোনও ধর্মীয় স্থান বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না’। বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ সংক্রান্ত এই মামলার শুনানিতে একথা স্পষ্ট করে জানাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।জানা গেছে, দমদম বিমানবন্দরে কাছে ৪০-৫০ বছর ধরে রয়েছে একটি মসজিদ। সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই নামাজ পড়ে আসেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষজন। তবে বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, -‘নিরাপত্তার ঝুঁকি হতে পারে। সেই কারণে ১১ জুলাই থেকে নামাজ পড়া বন্ধ’। এরপরই একটি মসজিদে ধর্মাচরণের অনুমতি পেতে মামলা হয় কলকাতা হাইকোর্টে ।এদিন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের একক বেঞ্চে ছিল সেই মামলার শুনানি।এদিন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের হয়ে কোর্টে সওয়াল করেন আইনজীবী সৌমিন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “বিমানবন্দর হল জনগণের জায়গা। সেটি মসজিদ বা নামাজের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। যে কোনও জায়গায় নামাজ পড়া যেতে পারে। বিদেশের একাধিক জায়গায় এমন উদাহরণ আছে।” তিনি এও জানান, “এই জমিটি অনেক আগেই অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৬১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি একটি বিজ্ঞপ্তি রয়েছে। বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এক জনস্বার্থে এই জমিটির প্রয়োজন ছিল।” কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের প্রশ্ন, “জমিটি কার কাছ থেকে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল?” উত্তর দিতে গিয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের আইনজীবী সৌমিন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, “স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে এটি অধিগ্রহণ করা হয়। এবং মসজিদের জন্যও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ১৯৫৫ সালের মিউটেশন সার্টিফিকেটের মামলা ছিল এটি। সকলকে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। যাতায়াতের সুবিধাও দেওয়া হয়েছিল। যে কেউ তাঁদের ধর্ম পালন করতে পারেন, কিন্তু কোনও একটি নির্দিষ্ট স্থানেই তা করবেন,এমন দাবি জানাতে পারেন না।”এরপর এও বলেন, “যেখানে নিরাপত্তা জড়িত, সেখানে মৌলিক অধিকারের নিয়ম প্রযোজ্য হয় না। নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি নিয়ে ১৩ মে ২০২৬ তারিখে সিভিল এভিয়েশন থেকে বিমানবন্দরকে চিঠি দেওয়া হয়। ২৩ মে সমস্ত অংশীদারদের নিয়ে একটি বৈঠক হয়। বিমানবন্দরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দমদমের বাঁকড়া মসজিদ কমিটির সদস্যরাও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জানানো হয়, উড়ানের ওঠা-নামায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। বিমানের অবতরণ করতেও সমস্যা হচ্ছে। এরপর সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেন যে বিমানবন্দরে প্রবেশের গেটটি ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হবে। এটি রাতারাতি করা হয়নি, তাঁদের বক্তব্য শোনা হয়েছিল। এখানে জাতীয় ও বিমান চলাচলের নিরাপত্তা জড়িত, তাই কোনও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের প্রয়োজন নেই।”তিনি বলেন, “বৃহত্তর স্বার্থে ধর্মীয় স্থান গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর আগে বিভিন্ন জায়গায় চার্চ,মন্দির জাতীয় সড়কের জন্য জমি নেওয়া হয়েছে।এর ফলে ধর্মীয়স্থানে জমি নেওয়া যায় রাজ্যের অধিকার আছে। ওই জমি রাজ্যের সেটা জানে মসজিদ কর্তৃপক্ষ।” আইনজীবী এই মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। হাইকোর্টের কাছে তাঁর আর্জি, “কোনও অন্তর্বতী নির্দেশ দেবেন না।”কেন্দ্রের হয়ে সওয়াল করেছেন আইনজীবী ধীরজ ত্রিবেদী।তিনি এজলাসে বলেন,”সংবিধান অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণের সময় মসজিদ বলে আলাদা কোনও সুবিধা পায় না। রানওয়ে কাছে অবস্থিত এই মসজিদ। ভৌগলিক অবস্থান এমন যে, এখানে নামাজের অনুমতি দেওয়া যায় না। এইভাবে বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ সম্ভব নয়।” রাজ্যের উচ্চ আদালতে রাজ্যের সওয়াল, “এখানে কোনও মসজিদকে মন্দির বা অন্য কিছুতে পরিবর্তন করা হচ্ছে না। মৌলিক অধিকার পাবলিক প্লেসে সবসময় প্রযোজ্য নয়। এটি কোনও হেরিটেজ নয়। রাজ্য ইতিমধ্যেই অধিগ্রহণ করেছে। গত ১১ জুলাই ওই মসজিদে প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। তাঁদের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়। মামলাকারীর দাবি, সেখানে ওই মসজিদ ১৩৬ বছর ধরে রয়েছে। বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেট দিয়ে ওই মসজিদে প্রবেশের অনুমতি ছিল। এখন তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী কিশোর দত্তের সওয়াল, ৫০-৬০ জন মুসলিমকে বাসে করে ওই মসজিদে পৌঁছে দিতেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ দিন ধরে এটা চলে আসছে। হঠাৎ এখন তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর যুক্তি, মসজিদের জমি এখনও অধিগ্রহণ করেনি বিমানবন্দর। তার আগে কী ভাবে যাতায়াতে রাশ টানা যায়?১৩৬ বছর ধরে কোনও সমস্যা হয়নি। এখানে সকলে চেকিং করেই যায়।” এই মামলার পরবর্তী শুনানি ৯ অক্টোবর রয়েছে বলে জানা গেছে ।