প্রয়াত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বিভা সেনগুপ্ত

Spread the love

সৌরভ দত্ত, কলকাতা: মঙ্গলবার
রবীন্দ্রসংগীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের প্রয়াণ। ১৯৩৫ সালের ১২ মে ঐতিহ্যবাহী শান্তিনিকেতনে এক সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ও সুরসাধিকা বিভা সেনগুপ্ত। দীর্ঘ বর্ণময় জীবনের পর, ৬ অক্টোবর ২০২৬, মঙ্গলবার সকাল ৭টায় বিশ্বভারতী ও বঙ্গীয় সঙ্গীত সংস্কৃতি বলয়ের অন্যতম বরিষ্ঠ ও শ্রদ্ধেয় এই রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী এবং অসামান্যা সঙ্গীতশিক্ষিকা চিরতরে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
তাঁর প্রয়াণে সঙ্গীত জগতে এবং অগণিত ছাত্রছাত্রী ও অনুরাগীদের মধ্যে গভীর শোক ও শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। সঙ্গীত সাধনায় সুদীর্ঘ জীবনের অবসান ঘটিয়ে তাঁর এই প্রস্থানে, রবীন্দ্রসংগীতের ধারা এক পরম স্নেহময়ী অভিভাবিকা ও প্রকৃত ধারকের আলো থেকে বঞ্চিত করল।
বিভা সেনগুপ্ত ছিলেন সেই বিরল প্রজন্মের রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, যাঁরা গানকে কেবল পেশা বা পরিবেশনা হিসেবে গ্রহণ করেননি, বরং রবীন্দ্রনাথের গানকে জীবনের পরম উপাসনা ও অস্তিত্বের অংশ করে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপির প্রতি নিখুঁত আনুগত্য, শুদ্ধ উচ্চারণ, ভাব ও সুরের গভীর প্রকাশ এবং গম্ভীর গায়কী শৈলী ছিল তাঁর সাংগীতিক পরিচয়ের মূল স্তম্ভ। শান্তি নিকেতনী ঘরানার মার্জিত রূপ ও ঐতিহ্যকে তিনি আজীবন আগলে রেখেছিলেন।
সঙ্গীত পরিবেশনার পাশাপাশি সঙ্গীতশিক্ষিকা হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়। বহু দশক ধরে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে তিনি রবীন্দ্রসংগীতের সঠিক ব্যাকরণ, উচ্চারণ এবং নান্দনিক মূলবোধ শিক্ষা দিয়েছেন। বহু তরুণ ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পী তাঁরই শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজ সঙ্গীত জগতে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছেন।
দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ সাংগীতিক জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভা সেনগুপ্ত লাভ করেছেন বহু সম্মান ও পুরস্কার। তাঁর উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননার তালিকায় রয়েছে।
সুদীর্ঘকাল রবীন্দ্রসংগীত চর্চা ও প্রসারে বিশেষ অবদানের জন্য সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার জাতীয় সম্মাননা লাভ করেন।
রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে ও সঙ্গীতশিক্ষায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজ্য সরকারের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সঙ্গীত আকাদেমি
পুরস্কার অর্জন করেন।
রবীন্দ্রসংগীতের ধারাকে বিশ্বস্তভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্বের জন্য দেওয়া ট্যেগোর রত্ন পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বিশেষ সাংগীতিক সম্মান প্রদান করা হয়।
নানান মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রদত্ত সঙ্গীত সাধনায় সমগ্র জীবন উৎসর্গ করার সর্বজনীন স্বীকৃতিতে লাভ করেন তিনি।
বিভা সেনগুপ্তের প্রয়াণ, বাংলা সাংস্কৃতিক জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি; জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি রবিঠাকুরের সুর ও বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে গেছেন। তাঁর সুরের মূর্ছনা এবং শিক্ষাদানের সুমহান ঐতিহ্য তাঁর অগণিত ছাত্রছাত্রী ও রবীন্দ্রসংগীতপ্রেমীদের মাঝে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *