জেলে বন্দিদের দুর্দশা জীবন কাটাতে বিস্তারিত রিপোর্ট চাইলো কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ

Spread the love

মোল্লা জসিমউদ্দিন,সংবাদ আবির্ভাব

চলতি সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্যের বিভিন্ন জেলে বিচারধীন বন্দিদের নিয়ে গুরত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল। জেল হেফাজতে মৃত্যু থেকে শুরু করে জেলে বন্দিদের উপচে পড়া ভিড়, মহিলা বন্দিদের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে এইচআইভি-র মতো রোগের চিকিৎসা, রাজ্যের সংশোধনাগারগুলির সামগ্রিক পরিকাঠামো নিয়ে এবার কঠোর অবস্থান নিল কলকাতা হাইকোর্ট। বন্দিদের অধিকার রক্ষা ও পরিকাঠামো সংক্রান্ত এক মামলায় রাজ্য সরকারকে একগুচ্ছ কড়া নির্দেশ দিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করল ডিভিশন বেঞ্চ।কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি মহম্মদ শাব্বার রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, -‘নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রাজ্যকে এই সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দিতে হবে।’ রাজ্যের উচ্চ আদালতে রাজ্য যে রিপোর্ট জমা দিয়েছিল, সেখানে ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হেফাজতে মৃত্যুর তথ্য ছিল। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট নয় ডিভিশন বেঞ্চ । হাইকোর্টের নির্দেশ, -‘২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যত হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তার বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী রিপোর্টে যুক্ত করতে হবে’।শুধু তাই নয়, ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত জেলাভিত্তিক হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা (মৃতদের নাম ও ঠিকানাসহ) আগামী ৩১ জুলাই, ২০২৬-এর মধ্যে ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ’-এর সদস্য-সচিবের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।মৃত বন্দিদের পরিবারের কাছে ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষকে । মৃতদের আইনি উত্তরাধিকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে, প্রয়োজনে তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কাজ নিশ্চিত করতে হবে। পরবর্তী শুনানিতে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কাজ কতটা এগিয়েছে তার খতিয়ানও দেখতে চেয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ ।বিভিন্ন রাজ্যের সংশোধনাগারগুলির তীব্র কর্মীসংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ডিভিশন বেঞ্চ। সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৪ হাজার ৭৮৯টি হলেও বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ৩ হাজার ৩২২ জন। অর্থাৎ, ১ হাজার ৪৬৭টি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। এই মামলার শুনানি চলাকালীন রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল আদালতকে জানান, দ্রুত এই শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে কলকাতা হাইকোর্ট কেবল মৌখিক আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয় পরবর্তী রিপোর্টে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দিষ্ট সময়সীমা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। বিভিন্ন জেলে বন্দিদের অতিরিক্ত ভিড় নিয়েও রাজ্যের তুমুল সমালোচনা করেছে আদালত। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের ৬১টি সংশোধনাগারে ২১ হাজার ৯২৯ জন বন্দি রাখার ক্ষমতা থাকলেও, বর্তমানে সেখানে রয়েছেন ২৩ হাজার ৮৮৬ জন। অর্থাৎ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি রাখা হচ্ছে সংশোধনাগারগুলিতে। ঠিক এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য নতুন সংশোধনাগার নির্মাণের যে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে, তার নির্দিষ্ট সময়সূচিও পরবর্তী রিপোর্টে দিতে হবে। একই সঙ্গে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির পূর্বাভাস ও ভবিষ্যতে বন্দির সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে দীর্ঘমেয়াদি কী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, তাও জানতে চেয়েছে রাজ্যের উচ্চ আদালত।মহিলা বন্দিদের সুরক্ষা নিয়ে অত্যন্ত স্পর্শকাতর নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সংশোধনাগারে পুরুষ ও মহিলা বন্দিদের যাতায়াতের জন্য পৃথক প্রবেশ ও প্রস্থান পথ সিসিটিভির নজরদারিতে রয়েছে কি না? এবং মহিলা বন্দিদের তল্লাশির জন্য আলাদা গোপন ঘরের ব্যবস্থা রয়েছে কি না? তা পরবর্তী রিপোর্টে স্পষ্ট জানাতে হবে।অভিযোগ, জেল হেফাজতে থাকাকালীন কয়েকজন মহিলা বন্দি এইচআইভি পজিটিভ হয়েছেন। এই অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। সংশোধনাগারগুলিতে এই ধরণের রোগে আক্রান্ত বন্দিদের সঠিক সংখ্যা কত এবং তাঁদের চিকিৎসার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা সবিস্তারে জানানোর জন্য রাজ্যকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *